Monday, 5 October 2009

রবীন্দ্রনাথ'কে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ

(১)

হেই বুড়ামিয়া,দিনরাত কি এত আকিবুকি
কি এমন আসে যায় তোর আকনের ঢঙ্গে
জলপাই গেরুয়া বা খাকি রঙ্গে
কুন্দনের জংগে মোরা নিজেদের তরাই
তরংগভঙ্গে গর্জে বোলপুরের খোয়াই
বেগানা রাক্ষসি এক লালজবার রক্তে রঙ্গিলা
খোক্যোস খো্ক্যোসি সব বেহদ্দ উদিলা
হেই বুড়ামিয়া, কি এত আকিবুকি
চুমাচুমির আস্লেশে হুদাহুদির ফাকি

(২)

দেহ থেকে অদেহায়
মাংস থেকে মাটিতে গড়াতেই
তোর মুর্তি ধুলিস্মাতে মেতেছিল
নক্সাল্বাড়ির অর্বাচিনেরা
রাখে মুর্তি, মারে কে...
বুকে গেড়ে বসেছিল
সাজোয়ালদের ধুক পুক
সাওতালদের ধিতাং ধিতাং
রান্নাঘর শ্রেনির ভাওতা পাকঘর শ্রেনি বুঝে ফেলেছিল
কড়ায়গন্ডায়ঃরবীন্দ্রনাথ তুই আমাদের
প্রতেকের ব্যক্তিগত মাদ্রাসা, গুরুকুলা এবং বলিউড

(৩)

ঝাপটাবাজেরা ছিলইত ঐখানে
এবং আবহাওয়া দফতরের
লোমনাশকতার কারনে
আকাশে
মেঘ করলে বৃষ্টি হতেও পারে
আবার নাও পারে

নির্ভর করে
রবীন্দ্র জয়ন্তির দমকা কতটা অস্থির
কতটা মোমনাশক কতটা লোম বিনাশক
কতটা বর্ষা বিধায়ক
কারন, রবীন্দ্র সঙ্গিতে থাকলেও
তেরছা কাটা প্রকৃতির
কোনই বিশুদ্ধ স্বরলিপি নাই

(৪)

খোয়াইয়ের
ভরাকোটালে
কাকড়া আর কিকড়িদের
নির্বান-নগ্ন-দেহ
হিরক সুত্রের সঙ্কেতে কেপেছিল
অজন্তা ইলোরা খাজুরাহ
কিন্তু-নির্বান-কিন্তু-নিরাকার-কিন্তু-নির্মোহ...
এসবকে পিছে ফেলে বর্তমানের
মরাকোটালে
কাকড়া আর কিকড়িদের
সমস্বরঃ হতে চাই কেহ ফিরে চাই দেহ

(৫)

চারুলতাদের
চকিত চাহনিতে
ভুলভাল জোনাকিগুলো কাপে
মোম-মাখানো
আকাশের হাজারো লোমকুপে
কাপে নিশ্বাসঃ ভাঙ্গে রেলগাড়িঃ
উহু কুহু উহুদের কুসুমে পদ্মাপারের কুঠিবাড়ি
ভাঙ্গে যা কিছু ভাঙ্গবার কথাঃ
সুলুক সন্ধানি শুল্কতরুর আবেশে
মোমবাতিরা পারজাগতিক
ঐ ব্রক্ষচারি জোনাকিদের ছদ্মবেশে

(৬)

চন্ডালিকায় মেতেছে
গুরুচন্ডালি বতাসের অক্সিজেন
মানে দাবাগ্নির দাগনিধনি শেষে
ঝাকড়া ঝাকড়া সাবালক সাবালিকা মোমের উদ্দামে
জংগলজুড়ে জঙ্গলপোড়া কামের কোরক
বোলপুরে সাওতাল নিবাসে
জনগনমন আদিবাসে অনাদি উল্লাসের স্মারক

(৭)

শিখা ঝুকে ঝুকে
হালে পালে মাস্তুলে কেপে কেপে
ভুতগ্রস্থ এক য়্যলবাট্রসের অডানায় ভর
রামকিঙ্কর
শেখে নাই বর্নাশ্রমের মানা
দারুচিনি দ্বিপে অচল বেহেস্ত দোজখের জরিমানা

(৮)

সঞ্চয়িতার অক্ষরগূলোকে
হিশাব-বিগ্বানের তালাচাবিতে ঘুরিয়ে পেচিয়ে
কেউ বলে ধুপকাঠি কেউ বলে আগরবাতি
যেভাবেই জ্বলুক যেভাবেই পুড়ুক
ঐ আগরবাতিদের মরনে ঐ ধুপকাঠিদের স্মরনে
সঞ্চয়ি হিশাব খুলতে গিয়েও
ডাকঘরে ঠায় দাড়িয়েও
কে য্যনো গোধুলির গহিনে চিতকার করেছিলঃ
কোথাও কোন ডাকঘর নাই, কোথাও কোন ডাকঘর নাই...

(৯)

খুবই রহস্যঘন রবীন্দ্র-রসায়নাগার
শুধু ছুটি শধুই ছুটি সারা বছর মাস দিন বার
সে যজ্ঞে ঢূকিলে পরে আর সব যজ্ঞ্ব ফিকা
বানভাসি ভাতের হাড়িটে কামেল-ক্যমেলিয়ার কুহেলিকা

(১০)

উত্তরায়নের দুয়ার পেরিয়ে
সকাল নিজেই নিজের পর্দা
খাটিয়াগূলো গড়াতে গড়াতে
নবজাতকের দোলনায় বে-আব্রু
অমাবশয্যার নিকশ কালো ভ্রু বেয়ে বেয়ে
উত্তরায়নের দুয়ার পেরিয়ে
সুর্জ হয়ে উঠলো সাচিকাটা পান সুপারি জর্দা

(১১)

মাটির প্লাস্টিকের পিতলের
সোনার রুপার হিরার প্লাটিনামের
আরো আরো আলোভরা যত দামি দামি জহরত
মোড়াও তাহাকেঃ দেখাও অধ্বাত্মের কসরতঃ
পোড়াও তাহাকে খনি দেশের বিজন পাতালে
বৈশ্নব পদাবলি গলে বালক ভানুসিঙ্ঘের ফসিলে

(১২)

দম দেয়া পুরান-পুতুলার নাচন
মেলার দাদুর মাথায় খনি শ্রমিকের হেলমেট
রক্তকরবির ভরপেট সংরাগে দাত ফোকলা গৌতম
পরান জুড়িয়া গীতাঞ্জলি মালাইকারি কুলফিতে সিক্ত
বাদবাকি বর্নাস্রম সারিয়া প্রথা বাহ্য এবং অতিরিক্ত
পুরান-পুতুলার কস্টকে বোলনা মামুলি
ন্যায্য মজুরির যে আবহমান দাবি
গীতাঞ্জলি তার অধ্যত্ম
আর মেরুদন্ডের মজ্জায় রক্তকরবি


(১৩)

মনে পড়ে
আম্মা প্রতি শবে বরাতে টাকা দিত
তারাবাতি মোমবাতি কিনতে
মনে পড়ে
চঞ্চল দুই বালক বালিকা দৌড়ে দৌড়ে
বাংলো বাড়ির গোল বারান্দা জূড়ে
জ্বালাচ্ছে শত শত ছোট ছোট আঙ্গুল সাইজ মোমোবাতি
ছোট ছোট ভ্রুন ছোট ছোট হারানো জরায়ু
আম্মা বোলতোঃ
শবে বরাতে রবীন্দ্রপাঠে বাড়ে হায়াত দরাজ আয়ু

(১৪)

শরির ঢাকা তুষার পরত
লোকটা খসালো অনন্তকালের অন্তরে
চোখের পাপড়ি আর গর্তে জমাট তুষার সরাতে
দৃষ্টিজুড়ে জাগে মানুষ ও তার মৌসুমের বাইরে
মহাশুন্যের নির্ভার রিতুঃ
রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরায়ত নিভু-নোভা
লোকটার নাম কখনো 'অবাক' কখনো 'আভা'

(১৫)

নিজদেহে সে জ্বালায়
মৌয়ালের চাকভাঙ্গা দেহতত্ত্বের আলো
লালনের দর্পনে দেখলো লালনেরই
তাবত শরিরের সুরতহালঃ
কালবেলার চাল চুলার
পাই পাই হিশাব কষে
কলাপাতায় লিখলোঃ মাছের সওয়ারঃ
সংসারি মনিহার তাহার নাহি সাজে আর

(১৬)

ফিরে
এলো সে
যে-অগ্নিকুন্ডে
সে না সিতা
না বড়ব
রবীন্দ্র উচ্চারন শ্বাস্বত
এবং আজব

(১৭)

হাত বদল হতে হতে
কারখানা থেকে পাইকারে বা মুদি ঘরে
কখনো বাসরে কখনো কবরে

ঠোট পোড়ালো সে
শিতে ফাটা ঠোটের আস্লেষেঃ
ভালোবেশে নিজের দহন
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার
সর্বশ্রেষ্ঠ আস্ফালন

(১৮)

মহর্ষি হলেও হাচি, কাশি ও হিসি-যন্ত্রে
লোকটা অন্যান্যদের মতোই সাধারন ছিল
বা কখনো কখনো অসাধারনভাবে সচল
কারন দৈনন্দিনের টুকটাক খতিয়ান শেষে
রোজ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে
লোকটা পান করত এক গেলাস চিরতা
এভাবেই শুধ্ব হ'তো যাকে কেউ কেউ বলে
সালতামামির নামতা কেউ বা পরমাত্মার হালখাতা

(১৯)

পদ্মার পাঠশালায়ঃ নদিপারের ঘাটলাগুলোতে
ঘরকন্যাদের ভেজা ভেজা বাটলাগুলোর সাথে
বাসন কোসনের সম্পর্কের নিরিখে
লোকটা বুঝে নিত জোয়ার ও ভাটার সাথে
তামা, পিতল ও অন্যন্য ধাতবের আত্মিয়তা
যত বেশি ধোয়া পাখলা তত বেশি ভাল ফসল উঠেছে
আর নদিপারের জটলা যত কম
মহাজনের গদি তত সরগরমঃ
জোয়ারের ঘুঙ্গুর বাধা পড়েছে ভাটার টানে
ঘাটের কথাগুলো ভাঙ্গে নিরবতার প্রাচিন ইস্কুল

(২০)

পরমেশ্বরি গোলাপি মসুরির ডালে
রসুন পেয়াজ তেলে বাঘার দেয়া
জয়পুরের হাওয়া মহলে ঝাঝরিকাটা জানলাগুলো সয়
রাজস্থানি বালু সেচা গরম নিস্বাশ
খুধিত পাষানের পারমানবিক হাশফাশ

(২১)

ওয়াশিং মেশিনে ঢোকে
করতোয়া, কপোতাক্ষ, গোদাবরি,ডাকাতিয়া,
শিতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খা', রুপ নারানের স্বপ্রান উধ্বত জল
ফারাক্কায় থমকায় চমকায়
শান্তি নিকেতনের সম্পন্ন সাবান
ওয়াশিং মেশিন থেকে বেরোয়
একের পর এক রক্তাক্ত
ক্ষত বিক্ষত গীতবিতান

(২২)

তবুত পরিবিবি
কাদম্বরী দেবির প্রলাপে
ভরা বর্ষার ঠিক আগে আগে
কাঠফাটা কদমের সম্ভোগে
হঠাতই বন্য
হননের অনন্য বানে ডোবা নাইয়রিদের
নক্সিকাথায়ঃ দিন আনা দিন খাওয়া
সদরঘাটের ভারবাহি গুদারায়ঃ
হায় বিবি পরি হায় দেবি কাদম্বরী
হায় নিল নিল নিল বাংলাদেশের হংশি

(২৩)

মরন'রে তুই আমদের
জাপিত জিবনের জমজ অধ্যাপিকা
কুস্তাকুস্তি ধস্তাধস্তির ডাকনাম চয়ন
উল্লাস'কে ডাকি চয়নিকা

চয়ন'কে কষে বেধে
ওর দেহে যত ফুটাফাটা আছে
তার সবগুলো দিয়ে চয়নিকা রবিন্দ্রনাথ ভরে দিল
তারপর চয়নের হাড় মাংশ পচা সারে
বসরাই গোলাপ ফোটালো চয়নেরই ছায়ায়

তারপর, চয়নের দেহ কোথায়, চয়নের ছায়া কোথায়
এইসব বলে চয়নিকা পাড়া মাত করে চ্যচায়

হায় হায় হায় পাজি বুড়ামিয়াটার বেয়াক্কেল কারসাজি

(২৪)

ওরা কি কথা বলতে পারে
এরকমটা ভেবে চোখ খুলতেই
যেখানে ওদের গলা থাকবার কথা
সেখানে ও দেখতে পেল কোমড়ার লতা

ওরা কি দেখতে পায়
এরকমটা ভেবে চোখের জায়গায়
ও দেখতে পেল চাকভাঙ্গা মোম

গলতে গলতে
কোমড়া ফুলের সাথে
মৌমাছিদের হুলোহুলি দোস্তালির পর
মাচার ওপর আসন পেতে

নিজের রসে ও রসবতি হতে থাকলো
যেখানে আসলে কোমড়াদের বসবার কথা
একে অন্যের কোলে
কোমড়াদের কোরকিরাই রবীন্দ্রসঙ্গিতের সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রোতা

(২৫)

গান শুনতে শুনতে
আনাজপাতি সব হয়ে উঠলো নিল
নিল গড়ালো লালে, লাল গড়ালো সবুজে
লাল সবুজ নিলেরা নিজেদের খোশা ছাড়িয়ে
লবন মরিচ মাখিয়ে
একে অন্যকে খেতে থাকলো আর
পরস্পরের পাকস্থলিতে হজম হতে হতে
ভাবতে থাকলো ঘটবার কথা ছিল অন্যরকম
উলটাপালটা খাওয়াখাওয়িতে
ঘটে গেল যাকে আমরা বলি মন্দের ভালো
লাল সবুজ নিল মিশিয়েই তৈরি বিদ্যুতের সাদা আলো

(২৬)

ঐ চাকমা হিদল ঐ আচিক অসিম
দেহছিন্ন অংগগুলো বিচ্ছেদের চুড়ান্ত সঙ্কেতে
আকড়ে খামচে ধরে আছে প্রত্যংগুলো
যা নাই তা ধরে রাখা অসম্ভব জেনেও

হাতগুলোর পাশে দস্তানা বেয়নেট এবং গিটার
পাগূলোর পাশে বুট মহুয়ার সিকড় ও ঘুঙ্গুর
চোখের গর্তে মোমবাতি আর থেতলানো মৌচাক
পাজরের ভাঙ্গা হাড়ে গীতবিতান কিন্তু তখনো টানটানঃ
দেহ সংলগ্ন অদেহা গানগুলো
দেহকে আলতো আদরে পৌছে দিয়েছিল
সম্ভ্রমের সিমানায়

ঐটুকুই ও করতে পারত
ঐটুকুই ও করেছিল মগ্ন চেতনার সমাদরে

(২৭)

১৯৭১ এর চোখবাধা নিরিহ কবিতাগুলো
গদ্য কাঠামোদের সাথে যাবতিয় ভুল বোঝাবোঝি
এবং সমঝোতাসহ জন্মানোর পর
মরন অব্দি যার যা চোখ কান নাক
অবশিষ্ট ছিল তা উপড়ে নেবার সিধান্ত নিয়েছিল

অন্ধ শরিরগুলো যখন আবার জিবনে ফিরে এলো
তখন বূঝলো যে চোখ বাধবার কোন প্রয়োজন ছিলনা
কারন চোখের জায়গাতে চোখ কখনোই ছিলনা

পিছমোড়া চোখবাধা চোখগুলোদের কেউ কেউ
চোখের বালি উপন্যাসটা পড়েছিল

(২৮)

গীত
বিতান
জ়্বলে
পেট্রলে
পাতালেঃ সরাইলের খোলামিলে
চাঙ্খার পুলের জরুরি হাসপাতালে
এমনকি হরতালে
যখন মানুষেরা
আর আর মানুষদের পেট্রলে পোড়ায়
গীতবিতান তখনো চলে খোড়ায় খোড়ায়
পরম-মানবিক-ফসিলে
পেট্রল ওড়ে, পেট্রল পোড়ে
বিশাল বেলুনের ভর
গীতবিতান ভাসে মেঘের ওপর

চয়ন খায়রুল হাবিব
এপ্রিল-জুন/২০০৯
লন্ডন